Header Ads Widget

লেনদেন ও সামাজিক ন্যায়বিচার (মুআমালাত) সংক্রান্ত বিষয়গুলোর কুরআন ও হাদিসের দলিল

বাংলা নিউজ : ইসলামী শরীয়াহ্‌তে মুআমালাত (লেনদেন ও সামাজিক আচরণ) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অর্থ-সম্পদের সঠিক আদান-প্রদান এবং সামাজিক বিচারব্যবস্থা পরিচালনায় আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল (সা.) সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন।


নিচে লেনদেন ও সামাজিক ন্যায়বিচার সংক্রান্ত ১০টি মৌলিক বিষয়ের ওপর কুরআন ও সুন্নাহর দলিলসহ বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হলো:

১. ব্যবসায় সততা ও সত্যবাদিতা বজায় রাখা

ব্যবসা-বাণিজ্য হালাল উপায়ে পরিচালনা করা এবং কেনাবেচায় মিথ্যা ও প্রতারণা বর্জন করা ওয়াজিব।

  • কুরআনের দলিল:

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ

    "হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয়, তা আলাদা।" — সূরা আন-নিসা (৪:২৯)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "সত্যবাদী ও আমানতদার ব্যবসায়ী (কিয়ামতের দিন) নবী, সিদ্দীক ও শহীদগণের সাথে থাকবেন।" — জামে তিরমিজি: ১২০৯

২. ওজনে ও মাপে কম না দেওয়া (ইনসাফ রাখা)

পণ্য কেনাবেচার সময় মাপে কম দেওয়া কবিরা গুনাহ ও সামাজিক ধ্বংসের অন্যতম কারণ।

  • কুরআনের দলিল:

    وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ

    "আর তোমরা মেপে ও ওজন দেওয়ার সময় ন্যায়সঙ্গতভাবে পূর্ণমাত্রায় দাও।" — সূরা আল-আনআম (৬:১৫২)

  • হাদিসের দলিল:

    আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) মাপ ও ওজনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে বলেন:
    "তোমাদের এমন দুটি বিষয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যে বিষয়ে অবহেলা করার কারণে পূর্ববর্তী উম্মতসমূহ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।" — জামে তিরমিজি: ১২১৭

৩. ঘুষ লেনদেন সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা

সামাজিক ন্যায়বিচার ধ্বংসকারী সবচেয়ে মারাত্মক অপরাধগুলোর একটি হলো ঘুষ।

  • কুরআনের দলিল:

    وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ

    "তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের ধন-সম্পদ খেয়ো না এবং মানুষের ধন-সম্পদের কিছু অংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার জন্য বিচারকদের ঘুষ দিয়ো না।" — সূরা আল-বাকারা (২:১৮৮)

  • হাদিসের দলিল:

    আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত:
    "রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘুষদাতা এবং ঘুষগ্রহীতা উভয়ের ওপর অভিশাপ করেছেন।" — সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৮০, জামে তিরমিজি: ১৩৩৭

৪. পণ্যের কৃত্রিম সংকট (মজুতদারি) না করা

জনসাধারণকে কষ্টে ফেলে পণ্যের দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কৃত্রিমভাবে মাল আটকে রাখা ইসলামে হারাম।

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "কেবল পাপাচারী ও অপরাধী ব্যক্তিই মজুতদারি (ইহতিকার) করে।" — সহিহ মুসলিম: ১৬০৫

  • হাদিসের দলিল:

    নবীজি (সা.) আরও বলেছেন:
    "যে ব্যক্তি বাজারে পণ্য সরবরাহ করে সে রিজিকপ্রাপ্ত হয়, আর যে ব্যক্তি পণ্য আটকে রাখে (মজুতদারি করে) সে অভিশপ্ত হয়।" — সুনানে ইবনে মাজাহ: ২১৫৩

৫. জুয়া ও ভাগ্যের খেলা বর্জন করা

যেকোনো ধরনের জুয়া বা অনিশ্চিত ভাগ্যের খেলা, যাতে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে অর্জিত হয়, তা হারাম।

  • কুরআনের দলিল:

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

    "হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্যনির্ণায়ক তীর—এসবই শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং তোমরা তা থেকে দূরে থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" — সূরা আল-মায়েদাহ (৫:৯০)

৬. চুক্তি ও ওয়াদা রক্ষা করা

ব্যক্তিগত, বাণিজ্যিক কিংবা সামাজিক লেনদেনের সকল চুক্তি বিশ্বস্ততার সাথে পূরণ করা ফরজ।

  • কুরআনের দলিল:

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ

    "হে ঈমানদারগণ! তোমরা চুক্তি ও অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো।" — সূরা আল-মায়েদাহ (৫:১)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "মুসলিমগণ তাদের শর্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে (চুক্তি মেনে চলবে); তবে যে শর্ত কোনো হালালকে হারাম করে বা হারামকে হালাল করে, তা ব্যতীত।" — জামে তিরমিজি: ১৩৫২

৭. জমি ও সম্পত্তি দখল না করা

অন্যায়ভাবে অন্যের এক বিঘত জমি দখল করাও কঠিন অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "যে ব্যক্তি জুলুম করে কারও এক বিঘত জমিও আত্মসাৎ করবে, কেয়ামতের দিন সাত স্তবক জমিন তার গলায় বেড়ি হিসেবে পরিয়ে দেওয়া হবে।" — সহিহ বুখারি: ২৪৫৩, সহিহ মুসলিম: ১৬১০

৮. বিচারে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ কায়েম করা

সামাজিক বিচারে কোনো স্বজনপ্রীতি, শত্রুর প্রতি বৈরিতা বা অর্থ-সম্পদের প্রলোভনে পড়ে অবিচার করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

  • কুরআনের দলিল:

    إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ

    "নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার (ইনসাফ) ও অনুগ্রহের নির্দেশ দিচ্ছেন।" — সূরা আন-নহল (১৬:৯০)

  • কুরআনের দলিল:

    وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ

    "আর যখন তোমরা মানুষের মাঝে বিচার-ফয়সালা করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে।" — সূরা আন-নিসা (৪:৫৮)

৯. সত্য সাক্ষ্য দেওয়া ও সাক্ষ্য গোপন না করা

আদালত বা সামাজিক বিচারে সত্য সাক্ষ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক; মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া বা সত্য গোপন করা কবিরা গুনাহ।

  • কুরআনের দলিল:

    وَلَا تَكْتُمُوا الشَّهَادَةَ ۚ وَمَن يَكْتُمْهَا فَإِنَّهُ آثِمٌ قَلْبُهُ

    "আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন কোরো না; যে ব্যক্তি তা গোপন করে, তার অন্তর পাপী।" — সূরা আল-বাকারা (২:২৮৩)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সা.) তিনবার বললেন, "আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহগুলো সম্পর্কে জানাব না?" সাহাবিগণ বললেন, 'হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল!' তিনি বললেন: "আল্লাহর সাথে শিরক করা, মা-বাবার অবাধ্য হওয়া..." এরপর তিনি সোজা হয়ে বসে বললেন: "শোনো! আর মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া ও মিথ্যা কথা বলা!" — সহিহ বুখারি: ২৬৫৪

১০. উত্তরাধিকারীদের মাঝে সঠিকভাবে সম্পত্তি বন্টন করা

মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি নিজের ইচ্ছামতো না দিয়ে শরীয়তের নির্ধারিত ফারায়েজ (উত্তরাধিকার আইন) অনুযায়ী বন্টন করা ফরজ।

  • কুরআনের দলিল:

    لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ ۚ نَصِيبًا مَّفْرُوضًا

    "পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে পুরুষদের অংশ রয়েছে এবং পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ রয়েছে—সম্পদ কম হোক বা বেশি, এটি একটি নির্ধারিত অংশ।" — সূরা আন-নিসা (৪:৭)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ