Header Ads Widget

জ্ঞান অর্জন ও শরীয়তের অনুশাসন (ইলম) সংক্রান্ত বিষয়গুলোর কুরআন ও হাদিসের দলিল

 



বাংলা নিউজ : ইসলামী শরীয়াহ্‌তে ইলম (দ্বীনি জ্ঞান) অর্জন করা এবং শরীয়তের বিধি-বিধান জানা ও মেনে চলা প্রতিটি মুসলিমের ওপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অজ্ঞতা থেকে বেঁচে থাকা এবং সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার জন্য সঠিক ইলমের কোনো বিকল্প নেই।


নিচে জ্ঞান অর্জন ও শরীয়তের অনুশাসন সংক্রান্ত ১০টি মৌলিক বিষয়ের ওপর কুরআন ও হাদিসের দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা প্রদান করা হলো:

১. দ্বীনের প্রাথমিক ও অপরিহার্য জ্ঞান (ফরজে আইন) অর্জন করা

নিজের আকাইদ, ইবাদত, হালাল-হারাম ও দৈনন্দিন জীবনের শরীয়তি বিধান জানা প্রতিটি মুসলিম পুরুষ ও নারীর ওপর আবশ্যিক কর্তব্য।

  • কুরআনের দলিল:

    فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنبِكَ

    "অতএব জেনে রাখুন যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্য মাবুদ নেই এবং আপনার ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।" — সূরা মুহাম্মদ (৪৭:১৯)

    (ইমাম বুখারি রহ. এ আয়াত দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, কথা ও কাজের পূর্বে ‘জ্ঞান’ অর্জন করা আবশ্যক।)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "জ্ঞান (ইলম) অর্জন করা প্রতিটি মুসলিমের ওপর ফরজ (অবশ্যই পালনীয়)।" — সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৪

২. আলেমদের সান্নিধ্য গ্রহণ ও অজানা বিধান জেনে নেওয়া

দ্বীনের যেকোনো জটিল বিষয় বা অজানা মাসআলা বান বানিয়ে না বলে বিজ্ঞ ও পরহেজগার আলেমদের থেকে জেনে নেওয়া আবশ্যক।

  • কুরআনের দলিল:

    فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ

    "সুতরাং তোমরা জ্ঞানীদের (আলেমদের) জিজ্ঞাসা করো, যদি তোমরা না জানো।" — সূরা আন-নহল (১৬:৪৩)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "নিশ্চয়ই আলেমরা হলেন নবীদের ওয়ারিশ (উত্তরাধিকারী)। আর নবীরা কোনো দিনার বা দিরহাম (টাকা-পয়সা) মিরাস হিসেবে রেখে যাননি, তারা রেখে গেছেন কেবল জ্ঞান। সুতরাং যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করল, সে পূর্ণ অংশ গ্রহণ করল।" — সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৪১, জামে তিরমিজি: ২৬৮২

৩. বিশুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত ও তা অনুধাবন করা

কুরআন কারীম সহিহ-শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করা শিখা এবং সালাত আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় অংশ মুখস্থ রাখা ওয়াজিব।

  • কুরআনের দলিল:

    وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا

    "এবং কুরআন তিলাওয়াত করুন ধীরে ধীরে ও স্পস্ট উচ্চারণ সহকারে (তাজবীদসহ)।" — সূরা আল-মুযযাম্মিল (৭৩:৪)

  • হাদিসের দলিল:

    ওসমান ইবনে আফফান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
    "তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সে-ই, যে নিজে কুরআন শেখে এবং অপরকে শিক্ষা দেয়।" — সহিহ বুখারি: ৫০২৭

৪. সুন্নাহর সঠিক অনুসরণ করা

নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহ হলো ইসলামি শরীয়তের দ্বিতীয় প্রধান উৎস। জীবনযাপনে তাঁর সুন্নত মান্য করা বাধ্যতামূলক।

  • কুরআনের দলিল:

    وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا

    "আর রাসুল তোমাদেরকে যা দেন তা তোমরা গ্রহণ করো, আর যা থেকে তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।" — সূরা আল-হশর (৫৯:৭)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "যে ব্যক্তি আমার সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।" — সহিহ বুখারি: ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম: ১৪০১

৫. বিদআত (দ্বীনে নতুন উদ্ভাবন) পরিহার করা

ইসলামের ইবাদত ও শরীয়তের কাঠামোর ভেতরে নতুন কোনো নিয়ম বা আকিদা বানিয়ে যুক্ত করা (বিদআত) মারাত্মক পাপাচার।

  • হাদিসের দলিল:

    উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
    "যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মাঝে এমন কিছু নতুন উদ্ভাবন করবে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।" — সহিহ বুখারি: ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম: ১৭১৮

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর খুতবায় বলতেন:
    "সর্বোত্তম বাণী হলো আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম পথনির্দেশ হলো মুহাম্মদের (সা.) পথনির্দেশ। আর নিকৃষ্টতম বিষয় হলো (দ্বীনের মধ্যে) নতুন উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ; এবং প্রতিটি বিদআতই পথভ্রষ্টতা।" — সহিহ মুসলিম: ৮৬৭

৬. অর্জিত ইলম অনুযায়ী আমল করা

শুধু জ্ঞান অর্জন করলেই চলবে না, বরং সেই অর্জিত ইলম অনুযায়ী নিজের জীবন পরিচালনা করা ফরজ।

  • কুরআনের দলিল:

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ ۝ كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ

    "হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা করো না, তা কেন বলো? তোমরা যা করো না তা বলা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত ক্রোধের বিষয়।" — সূরা আস-সফ (৬১:২-৩)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার দুই পা সরবে না যতক্ষণ না তাকে ৪টি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে... তার মধ্যে একটি হলো: তার ইলম (জ্ঞান) সম্পর্কে—সে অনুযায়ী সে কী আমল করেছে।" — জামে তিরমিজি: ২৪১৭

৭. যে পেশায় যুক্ত, তার হালাল-হারাম জেনে নেওয়া

ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, চিকিৎসক বা যেকোনো পেশার মানুষের জন্য তার নিজ নিজ পেশা সংক্রান্ত শরীয়তের বিধান জেনে নেওয়া আবশ্যক।

  • কুরআনের দলিল:

    وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ ۚ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا

    "যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে পোড়ো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর—এদের প্রতিটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।" — সূরা আল-ইসরা (১৭:৩৬)

  • হাদিসের দলিল:

    ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বাজার তদারকি করার সময় বলতেন:
    "আমাদের বাজারে যেন কেবল সে-ই ব্যবসা করে, যে দ্বীনের লেনদেন সংক্রান্ত ফিকহ (জ্ঞান) অর্জন করেছে; অন্যথায় সে না চাইলেও সুদে জড়িয়ে পড়বে।" — জামে তিরমিজি: ৪৮৭

৮. ইলম গোপন না করা ও তা অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া

অর্জিত সত্য জ্ঞান মানুষের কাছে প্রকাশ করা ওয়াজিব এবং তা গোপন করা অভিশপ্ত কাজ।

  • কুরআনের দলিল:

    إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَىٰ مِن بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ ۙ أُولَٰئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ

    "নিশ্চয়ই যারা আমার অবতীর্ণ স্পষ্ট নিদর্শন ও হেদায়েত গোপন করে—মানুষের জন্য কিতাবে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার পরও, আল্লাহ তাদের ওপর অভিশাপ দেন এবং অভিশাপকারীরাও তাদের অভিশাপ দেয়।" — সূরা আল-বাকারা (২:১৫৯)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "যে ব্যক্তিকে কোনো জ্ঞান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো এবং সে তা গোপন করল, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে আগুনের লাগাম পরিয়ে দেবেন।" — সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৫৮, জামে তিরমিজি: ২৬৪৯

৯. দ্বীনের ব্যাপারে অজ্ঞতাবশত আন্দাজে কথা না বলা

শরীয়তের বিধান বা কোনো ফতোয়া সুস্পষ্ট জ্ঞান ছাড়া নিজের মনগড়া বা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বলা মারাত্মক গুনাহ।

  • কুরআনের দলিল:

    قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَن تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ

    "বলুন, আমার রব কেবল হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ—যা প্রকাশ পায় ও যা গোপন থাকে, আর পাপকাজ, অন্যায় বিদ্রোহ, আল্লাহর সাথে এমন কিছুকে শরিক করা যার কোনো দলিল তিনি নাযিল করেননি এবং আল্লাহর সম্বন্ধে এমন কিছু বলা যা তোমরা জানো না।" — সূরা আল-আ'রাফ (৭:৩৩)

১০. ইলম অর্জনের বিশুদ্ধ নিয়ত রাখা (একনিষ্ঠতা)

দুনিয়াবী ধন-সম্পদ অর্জন, লোকদেখানো সম্মান বা বাহবা পাওয়ার নিয়তে ইলম অর্জন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "যে ব্যক্তি এমন কোনো ইলম অর্জন করল যার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা হয়, কিন্তু সে তা অর্জন করল কেবল কোনো দুনিয়াবী স্বার্থ হাসিলের জন্য—সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুবাসও পাবে না।" — সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৬৪, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৫২

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ