Header Ads Widget

তাহরাত ও পবিত্রতার ১০টি বিষয়ের কুরআন ও হাদিসের দলিল সহ বিস্তারিত

 


বাংলা নিউজ : ইসলামে তাহরাত (পবিত্রতা) ঈমানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।” (সহিহ মুসলিম: ২২৩)।


তাহরাত ও পবিত্রতা সম্পর্কিত ১০টি মৌলিক বিষয়ের ওপর কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিলসহ বিস্তারিত তথ্য নিচে প্রদান করা হলো:

১. দৈনন্দিন ইবাদতের জন্য শরীর ও পোশাকের পবিত্রতা

ইবাদত কবুল হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো শরীর এবং পরিহিত পোশাক পবিত্র রাখা।

  • কুরআনের দলিল:

    وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ

    "এবং আপনার পোশাক-পরিচ্ছদ পবিত্র রাখুন।" — সূরা আল-মুদ্দাসসির (৭৪:৪)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "পবিত্রতা ছাড়া কোনো সালাত কবুল হয় না এবং খেয়ানতের মালের কোনো সদকা কবুল হয় না।" — সহিহ মুসলিম: ২২৪

২. ওযুর ৪টি ফরজ আদায় করা

ওজু হলো সালাতের জন্য প্রধান শর্ত। ওজুর অঙ্গগুলো সঠিকভাবে ধৌত করা আবশ্যক।

  • কুরআনের দলিল:

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُؤُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ

    "হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা সালাতের জন্য প্রস্তুত হবে, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল এবং হাত জোড়া কনুইসহ ধৌত করো, মাথা মাসেহ করো এবং পা জোড়া টাখনুসহ ধৌত করো।" — সূরা আল-মায়েদাহ (৫:৬)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
    "আল্লাহ তাআলা তোমাদের কারও সালাত কবুল করেন না যখন সে অজু নষ্ট করে, যতক্ষণ না সে পুনরায় অজু করে।" — সহিহ বুখারি: ১৩৭

৩. ফরজ গোসল (জেনাবত, হায়েজ ও নিফাস থেকে পবিত্রতা)

অপবিত্রতার পর পূর্ণাঙ্গ শরীর পানি দিয়ে ধৌত করে গোসল করা আবশ্যক।

  • কুরআনের দলিল:

    وَإِن كُنتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا

    "আর যদি তোমরা অপবিত্র (জুনুবি) অবস্থায় থাকো, তবে বিশেষভাবে পবিত্রতা অর্জন (গোসল) করো।" — সূরা আল-মায়েদাহ (৫:৬)

  • হাদিসের দলিল:

    আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত:
    "নবীজি (সা.) যখন জানাবাত (অপবিত্রতা) থেকে গোসল করতেন, তখন প্রথমে হাত ধৌত করতেন, এরপর সালাতের অজুর মতো অজু করতেন, তারপর চুলে আঙুল দিয়ে পানি পৌঁছাতেন এবং পুরো শরীরে পানি ঢালতেন।" — সহিহ বুখারি: ২৪৮

৪. পানির অভাবে বা ব্যবহারে অক্ষমতায় তায়াম্মুম করা

পানি পাওয়া না গেলে বা অসুস্থতার কারণে পানি ব্যবহারে সক্ষম না হলে মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করা বিধান।

  • কুরআনের দলিল:

    فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُم مِّنْهُ

    "সুতরাং যদি তোমরা পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করো; তা দিয়ে তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করো।" — সূরা আল-মায়েদাহ (৫:৬)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
    "পবিত্র মাটি একজন মুসলিমের জন্য অজুর মাধ্যম, এমনকি যদি সে দশ বছরও পানি না পায়। তবে যখন সে পানি পাবে, তখন যেন তা শরীরে স্পর্শ করায় (গোসল/অজু করে)।" — সুনানে আবু দাউদ: ৩৩২, জামে তিরমিজি: ১২৪

৫. পেশাব-পায়খানা শেষে ইস্তিনজা ও পরিচ্ছন্নতা

শৌচকার্য সম্পাদন করা এবং নাপাকি সম্পূর্ণ দূর করা আবশ্যক।

  • কুরআনের দলিল:

    فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَن يَتَطَهَّرُوا ۚ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ

    "সেখানে এমন কিছু লোক রয়েছে যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করতে ভালোবাসে। আর আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।" — সূরা অত-তাওবাহ (৯:১০৮)

  • হাদিসের দলিল:

    আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত:
    "রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন শৌচাগারে যেতেন, আমি ও একটি ছেলে পানির পাত্র নিয়ে যেতাম এবং তিনি পানি দিয়ে ইস্তিনজা (পবিত্রতা অর্জন) করতেন।" — সহিহ বুখারি: ১৫০

৬. পেশাবের ছিটা থেকে বেঁচে থাকা

পেশাবের সূক্ষ্ম ছিটা শরীর বা কাপড়ে লাগা থেকে সতর্ক থাকা আবশ্যক, কারণ এটি কবরের আজাবের অন্যতম কারণ।

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সা.) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন:
    "তাদের দুজনকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, তবে কোনো কঠিন বিষয়ে দেওয়া হচ্ছে না (যা তারা এড়াতে পারতো না)। তাদের একজন পেশাবের ছিটা থেকে বেঁচে থাকতো না, আর অন্যজন চোগলখুরি করে বেড়াতো।" — সহিহ বুখারি: ২১৮, সহিহ মুসলিম: ২৯২

৭. সালাতের স্থান পবিত্র রাখা

যে স্থানে সালাত আদায় করা হবে, তা সকল প্রকার নাজাসাত (অপবিত্রতা) থেকে মুক্ত হতে হবে।

  • কুরআনের দলিল:

    وَعَهِدْنَا إِلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَن طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ

    "এবং আমি ইব্রাহিম ও ইসমাইলকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলাম যে, তোমরা আমার গৃহকে তওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখো।" — সূরা আল-বাকারা (২:১২৫)

  • হাদিসের দলিল:

    আনাস বিন মালিক (রা.) বর্ণিত:
    "এক দেহাতি লোক মসজিদে এসে পেশাব করে দিল। সাহাবিগণ তাকে থামাতে উদ্যত হলে নবীজি (সা.) বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। এরপর সে পেশাব শেষ করলে নবীজি এক বালতি পানি এনে তা সেখানে ঢেলে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।" — সহিহ বুখারি: ২২০

৮. হায়েজ ও নিফাসের পর গোসলের মাধ্যমে পবিত্রতা

ঋতুস্রাব বা সন্তান জন্মোত্তর রক্তস্রাব শেষ হলে সালাত ও সিয়ামের জন্য গোসল করে পবিত্র হওয়া আবশ্যক।

  • কুরআনের দলিল:

    وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ ۖ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ ۖ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّىٰ يَطْهُرْنَ ۖ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللَّهُ

    "তারা আপনাকে ঋতুস্রাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, তা অশুচি। সুতরাং তোমরা ঋতুস্রাবকালে নারীদের থেকে আলাদা থাকো এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। তারপর যখন তারা পুরোপুরি পবিত্র হবে (গোসল করবে), তখন তাদের কাছে যাও..." — সূরা আল-বাকারা (২:২২২)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সা.) ফাতেমা বিনতে আবি হুবাইশ (রা.)-কে বলেছিলেন:
    "যখন হায়েজ শুরু হয়, তখন সালাত ছেড়ে দাও। আর যখন তার সময় পার হয়ে যাবে, তখন তোমার শরীর থেকে রক্ত ধুয়ে ফেলো এবং গোসল করে সালাত আদায় করো।" — সহিহ বুখারি: ৩২০

৯. সহজাত প্রাকৃতিক পরিচ্ছন্নতা (ফিতরাত) বজায় রাখা

নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা, বগলের চুল উপড়ানো ও নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা ইসলামে নির্দেশিত প্রাকৃতিক পরিচ্ছন্নতা।

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "ফিতরাত (প্রাকৃতিক স্বভাবজাত পরিচ্ছন্নতা) পাঁচটি বিষয়: খাতনা করা, নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা, নখ কাটা, বগলের চুল উপড়ে ফেলা এবং গোঁফ খাটো করা।" — সহিহ বুখারি: ৫৮৮৯, সহিহ মুসলিম: ২৫৭

১০. মেসওয়াক করা ও মুখের পরিচ্ছন্নতা

ইবাদত ও সামাজিক জীবনের জন্য মুখের দুর্গন্ধ দূর করা ও মেসওয়াক করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "মেসওয়াক হলো মুখের পবিত্রতার মাধ্যম এবং রবের সন্তুষ্টি অর্জনের উপায়।" — সুনানে নাসায়ি: ৫, সহিহ বুখারি (তাঅলিকাত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ