Header Ads Widget

পারিবারিক ও বৈবাহিক বিধান (মুআশারাত) সংক্রান্ত বিষয়গুলোর কুরআন ও হাদিসের দলিল

 


বাংলা নিউজ : ইসলামী শরীয়াহ্‌তে মুআশারাত (পারিবারিক ও বৈবাহিক জীবনচর্চা) অত্যন্ত গুরুত্ববহ একটি অধ্যায়। একটি সুস্থ, শান্তিময় ও ইনসাফপূর্ণ পরিবার গঠনের জন্য আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল (সা.) বৈবাহিক বন্ধন, দম্পতিদের অধিকার, পিতা-মাতা ও সন্তানের কর্তব্য সংক্রান্ত সুস্পষ্ট বিধান দিয়েছেন।


নিচে পারিবারিক ও বৈবাহিক বিধান সংক্রান্ত ১০টি মৌলিক বিষয়ের কুরআন ও হাদিসের দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা প্রদান করা হলো:

১. বিবাহের শুভ সূচনা (ইজাব, কবুল ও মহরানা নির্ধারণ)

ইসলামে বিবাহ একটি পবিত্র আকদ বা শক্ত সামাজিক ও দ্বীনি চুক্তি। এতে কনের সম্মতি ও মহর নির্ধারণ করা ওয়াজিব।

  • কুরআনের দলিল:

    وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً ۚ فَإِن طِبْنَ لَكُمْ عَن شَيْءٍ مِّنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَّرِيئًا

    "আর তোমরা নারীদেরকে তাদের মহর আনন্দের সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদান করো। এরপর তারা যদি খুশি হয়ে তার কিছু অংশ তোমাদের ছাড় দেয়, তবে তোমরা তা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ করতে পারো।" — সূরা আন-নিসা (৪:৪)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "যেসব শর্ত পূরণ করা তোমাদের ওপর সবচেয়ে বেশি আবশ্যক, তা হলো সেই শর্তাবলি—যার মাধ্যমে তোমরা স্ত্রীদের (শারীরিক ও বৈবাহিকভাবে) নিজেদের জন্য হালাল করেছ (অর্থাৎ মহর ও বিবাহের আকদের শর্তাবলি)।" — সহিহ বুখারি: ২৭২১, সহিহ মুসলিম: ১৪১৮

২. স্ত্রীর অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা (নফকা)

সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীর যাবতীয় মৌলিক চাহিদা (খাবার, পরিধেয় বস্ত্র ও থাকার স্থান) পূরণ করা স্বামীর ওপর ওয়াজিব।

  • কুরআনের দলিল:

    لِيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ ۖ وَمَن قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ

    "বিত্তবানদের নিজস্ব সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করা উচিত। আর যার রিজিক সংকুচিত, সে আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকেই ব্যয় করবে।" — সূরা আত-ত্বলাক (৬৫:৭)

  • হাদিসের দলিল:

    বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্ত্রীর অধিকার সম্পর্কে বলেন:
    "তাদের (স্ত্রীদের) অধিকার হলো তোমরা সাধ্যমতো তাদের জন্য উত্তম খাবার ও পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করবে।" — জামে তিরমিজি: ১১৬৩, সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৫১

৩. স্ত্রীর সাথে সুন্দর আচরণ ও সদ্ভাব বজায় রাখা

পারিবারিক জীবনে স্ত্রীর সাথে কর্কশ বা অন্যায় আচরণ না করে ভালোবাসা ও সহমর্মিতার পরিচয় দেওয়া শরীয়তের স্পষ্ট নির্দেশ।

  • কুরআনের দলিল:

    وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ

    "আর তোমরা নারীদের সাথে সৎ ও সুন্দরভাবে জীবন যাপন করো।" — সূরা আন-নিসা (৪:১৯)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের কাছে তোমাদের চেয়েও বেশি উত্তম।" — জামে তিরমিজি: ৩৮৯৫

৪. পিতা-মাতার প্রতি আনুগত্য ও তাদের সেবা করা

পিতা-মাতার খেদমত করা ইসলামের অন্যতম সেরা ইবাদত। তাদের কোনো কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করাও মারাত্মক গুনাহ।

  • কুরআনের দলিল:

    وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا

    "তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন বা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদের ‘উফ’ বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না; বরং তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বলো।" — সূরা আল-ইসরা (১৭:২৩)

  • হাদিসের দলিল:

    এক সাহাবি এসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, মানুষের মধ্যে আমার থেকে উত্তম আচরণ পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে? নবীজি (সা.) বললেন: "তোমার মা।" তিনি বললেন, তারপর কে? তিনি বললেন: "তোমার মা।" তিনি বললেন, তারপর কে? তিনি বললেন: "তোমার মা।" তিনি বললেন, তারপর কে? নবীজি বললেন: "তোমার বাবা।" — সহিহ বুখারি: ৫৯৭১, সহিহ মুসলিম: ২৫৪৮

৫. সন্তানের সঠিক শিক্ষা ও লালন-পালন করা

সন্তানকে দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া, হালাল উপার্জন দিয়ে বড় করা এবং সুন্দর নাম রাখা পিতা-মাতার ওপর আমানত।

  • কুরআনের দলিল:

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

    "হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও।" — সূরা আত-তাহরীম (৬৬:৬)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল (রাঈ) এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের অভিভাবক এবং সে তার অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে..." — সহিহ বুখারি: ৮৯৩, সহিহ মুসলিম: ১৮২৯

৬. সন্তানদের মাঝে সমান ইনসাফ রক্ষা করা

ছেলে কিংবা মেয়ে সন্তান—কারও প্রতি বৈষম্য না করে সমান ভালোবাসা, উপহার ও সুযোগ প্রদান করা ওয়াজিব।

  • হাদিসের দলিল:

    নুমান ইবনে বশীর (রা.) থেকে বর্ণিত, তার পিতা তাকে একটি উপহার দিলে রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি কি তোমার সব সন্তানকে এর রূপ উপহার দিয়েছ?" তিনি বললেন, 'না'। তখন নবীজি (সা.) বললেন:
    "তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মাঝে ইনসাফ (সমতা) বজায় রাখো।" — সহিহ বুখারি: ২৫৮৭, সহিহ মুসলিম: ১৬২৩

৭. নিকটাত্মীয়দের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক (সিলাতুর রাহিম) বজায় রাখা

পরিবারের বাইরের নিকটাত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং বিপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো ঈমানের আলামত।

  • কুরআনের দলিল:

    وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ

    "আর সেই আল্লাহকে ভয় করো যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে অধিকার দাবি করো এবং রক্তসম্পর্কিত আত্মীয়দের ব্যাপারে সতর্ক থাকো (সম্পর্ক ছিন্ন কোরো না)।" — সূরা আন-নিসা (৪:১)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "যে ব্যক্তি চায় যে তার রিজিক বৃদ্ধি পাক এবং তার আয়ু দীর্ঘ হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।" — সহিহ বুখারি: ২০৬৭, সহিহ মুসলিম: ২৫৫৭

৮. একাধিক স্ত্রী থাকলে সমান সমতা প্রতিষ্ঠা করা

যদি কোনো পুরুষ শরীয়তসম্মত কারণে একাধিক বিবাহ করে, তবে তাদের বাসস্থান, খাবার, পোশাক ও সান্নিধ্যের মাঝে পূর্ণ ইনসাফ করা ফরজ।

  • কুরআনের দলিল:

    فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً

    "তবে তোমরা যদি আশঙ্কা করো যে (একাধিক স্ত্রীর মাঝে) ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একজনকে নিয়েই থাকো।" — সূরা আন-নিসা (৪:৩)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
    "যে ব্যক্তির দুজন স্ত্রী রয়েছে কিন্তু সে তাদের একজনের দিকে হেলে পড়ে (ইনসাফ না করে), কিয়ামতের দিন সে এমন অবস্থায় উঠবে যে তার এক পাশ অবশ বা অবলুপ্ত থাকবে।" — সুনানে আবু দাউদ: ২১৩৩, জামে তিরমিজি: ১১৪১

৯. তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে শরীয়তের নিয়ম মেনে চলা

অপরিহার্য কোনো কারণ ছাড়া তালাক অপ্রিয়। তবে একান্ত প্রয়োজন হলে তা রাগের মাথায় একসাথে ৩ তালাক না দিয়ে শরীয়তসম্মত বিরতির (ইদ্দত) নিয়মে দিতে হয়।

  • কুরআনের দলিল:

    الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ

    "তালাক (যা ফেরাওয়া যায়) দুবার মাত্র। এরপর হয় ন্যায়সঙ্গতভাবে রেখে দেওয়া, না হয় সুন্দরভাবে বিদায় দেওয়া।" — সূরা আল-বাকারা (২:২২৯)

  • হাদিসের দলিল:

    রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট এক ব্যক্তি সম্পর্কে খবর পৌঁছাল যে, সে তার স্ত্রীকে একসাথে তিন তালাক দিয়েছে। নবীজি (সা.) ক্রুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন:
    "আমি তোমাদের মাঝে জীবিত থাকা অবস্থায়ই কি আল্লাহর কিতাব নিয়ে খেলা করা হচ্ছে?" — সুনানে নাসায়ি: ৩৪০১

১০. তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দতের বিধান

তালাকপ্রাপ্ত বা স্বামীহারা নারীকে নির্দিষ্ট সময় (ইদ্দত) পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় এবং এই সময়ে তার নিরাপত্তা ও থাকার ব্যবস্থা সুনিশ্চিত রাখতে হয়।

  • কুরআনের দলিল:

    وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ

    "আর তালাকপ্রাপ্তা নারীরা তিন হায়েজ (ঋতুস্রাব) পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত নিজেদেরকে (পুনর্বিবাহ থেকে) বিরত রাখবে।" — সূরা আল-বাকারা (২:২২৮)

  • কুরআনের দলিল (বিধবাদের জন্য):

    وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا

    "তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করে এবং স্ত্রীদের রেখে যায়, সেই স্ত্রীগণ চার মাস দশ দিন নিজেদের প্রতীক্ষায় রাখবে।" — সূরা আল-বাকারা (২:২৩৪)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ