বাংলা নিউজ : ইসলামী শরীয়াহ্তে খাদ্য, পানীয় ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের সুস্পষ্ট নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়েছে। মানুষের শারীরিক ও আত্মিক সুস্থতার জন্য কেবল হালাল খাবার ও পবিত্র জীবনধারা অনুসরণের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
নিচে দৈনন্দিন জীবন ও খাবারের বিধান সংক্রান্ত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কুরআন ও হাদিসের দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা প্রদান করা হলো:
১. কেবল হালাল ও পবিত্র খাবার গ্রহণ করা
যেকোনো খাবার বা পানীয় গ্রহণের পূর্বশর্ত হলো তা হালাল ও পবিত্র উৎস থেকে অর্জিত হওয়া।
- কুরআনের দলিল:يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَاشْكُرُوا لِلَّهِ إِن كُنتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ"হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদেরকে যেসব পবিত্র বস্তু রিজিক হিসেবে দিয়েছি, তা থেকে খাও এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো, যদি তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করো।" — সূরা আল-বাকারা (২:১৭২)
- হাদিসের দলিল:রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:"নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি কেবল পবিত্র জিনিসই কবুল করেন..." এরপর নবীজি এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দীর্ঘ সফর করে ব্যাকুল হয়ে দোয়া করে, কিন্তু তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম—তার দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে? — সহিহ মুসলিম: ১০১৫
২. হারাম খাবার (যেমন: শূকরের মাংস, মৃত পশু ও প্রবাহিত রক্ত) বর্জন করা
নির্দিষ্ট কিছু খাবার ও প্রাণীর মাংস ইসলামে সম্পূর্ণরূপে হারাম ও অপবিত্র ঘোষণা করা হয়েছে।
- কুরআনের দলিল:إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ وَلَحْمَ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللَّهِ"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর হারাম করেছেন মৃত পশু, প্রবাহিত রক্ত, শূকরের মাংস এবং যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে উৎসর্গ করা হয়েছে।" — সূরা আল-বাকারা (২:১৭৩)
- হাদিসের দলিল:ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:"তোমাদের জন্য দুটি মৃত প্রাণী ও দুটি রক্ত হালাল করা হয়েছে। দুটি মৃত প্রাণী হলো: মাছ ও পঙ্গপাল; আর দুটি রক্ত হলো: কলিজা ও প্লীহা (তিলা)।" — সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৩১৪, মুসনাদে আহমাদ: ৫৭২৪
৩. মদ ও সকল প্রকার মাদকদ্রব্য বর্জন করা
মদ বা যে বস্তু বুদ্ধি-বিবেককে আচ্ছন্ন করে (মাদক), তা সেবন ও লেনদেন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।
- কুরআনের দলিল:يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ"হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্যনির্ণায়ক তীর—এসবই শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং তোমরা তা থেকে দূরে থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" — সূরা আল-মাযেদাহ (৫:৯০)
- হাদিসের দলিল:রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:"প্রতিটি নেশাজাতীয় দ্রব্যই ‘খমর’ (মদ), আর প্রতিটি নেশাজাতীয় দ্রব্যই হারাম।" — সহিহ মুসলিম: ২০০৩
৪. আল্লাহর নামে (বিসমিল্লাহ বলে) পশু জবেহ করা
পশুর মাংস হালাল হওয়ার জন্য তা শরীয়তসম্মত নিয়মে আল্লাহর নাম নিয়ে জবেহ করা বাধ্যতামূলক।
- কুরআনের দলিল:فَكُلُوا مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ إِن كُنتُم بِآيَاتِهِ مُؤْمِنِينَ"সুতরাং তোমরা সেই পশুর মাংস খাও, যার ওপর (জবেহের সময়) আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে, যদি তোমরা তাঁর আয়াতের ওপর ঈমানদার হয়ে থাকো।" — সূরা আল-আনআম (৬:১১৮)
- হাদিসের দলিল:রাফে ইবনে খাদিজ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন:"যা থেকে রক্ত প্রবাহিত হয় এবং যার ওপর আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে, তা খাও।" — সহিহ বুখারি: ২৪৮৮, সহিহ মুসলিম: ১৯৬৮
৫. অপচয় ও অপব্যয় না করা
খাবার ও দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ অপচয় বা অপব্যয় করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
- কুরআনের দলিল:وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ"আর তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় কোরো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।" — সূরা আল-আ'রাফ (৭:৩১)
- হাদিসের দলিল:রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:"তোমরা খাও, পান করো, দান করো এবং পোশাক পরিধান করো, যতক্ষণ না তাতে অপচয় বা অহংকার মিশে যায়।" — সুনানে নাসায়ি: ২৫৫৯, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৬০৫
৬. পুরুষের জন্য সোনা ও রেশমি কাপড় ব্যবহার পরিহার করা
দৈনন্দিন পোশাক ও অলঙ্কার ব্যবহারে পুরুষের জন্য সোনা ও খাঁটি রেশম পোশাক হারাম করা হয়েছে (তবে নারীদের জন্য হালাল)।
- হাদিসের দলিল:আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত:"নবীজি (সা.) এক হাতে রেশমি কাপড় এবং অন্য হাতে সোনা নিয়ে বললেন: 'এই দুটি জিনিস আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম এবং নারীদের জন্য হালাল।'" — সুনানে আবু দাউদ: ৪০৫৭, সুনানে নাসায়ি: ৫১৪৪
৭. বিপরীত লিঙ্গের বেশভূষা ধারণ না করা
পোশাক, চালচলন ও ফ্যাশনে পুরুষের জন্য নারীর মতো এবং নারীর জন্য পুরুষের মতো রূপ ধারণ করা অভিশপ্ত কাজ।
- হাদিসের দলিল:আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত:"রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নারীবেশী পুরুষদের ওপর এবং পুরুষবেশী নারীদের ওপর অভিশাপ (লানত) করেছেন।" — সহিহ বুখারি: ৫৮৮৫
৮. শরীর ও চেহারায় বিকৃতি না ঘটানো (যেমন: ট্যাটু বা উল্কি আঁকা)
সৌন্দর্যবর্ধনের নামে শরীরের স্বাভাবিক গঠনে শরীয়তবিরোধী স্থায়ী পরিবর্তন বা ট্যাটু করানো নিষিদ্ধ।
- হাদিসের দলিল:আবদুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রা.) থেকে বর্ণিত:"আল্লাহ তাআলা লানত করেছেন সেসব নারীর ওপর, যারা ট্যাটু বা উল্কি আঁকে এবং যারা আঁকায়, আর যারা সৌন্দর্যের জন্য ভুরু উপড়ে ফেলে বা দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে—যারা আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন আনে।" — সহিহ বুখারি: ৪৮৮৬, সহিহ মুসলিম: ২১২৫
৯. খাবার ও পানীয় গ্রহণে ইসলামি শিষ্টাচার মেনে চলা
ডান হাতে খাওয়া, বসে পান করা এবং খাবার অতিরিক্ত ভরপেট না খেয়ে পরিমিত খাওয়া সুন্নত ও উত্তম বিধান।
- হাদিসের দলিল:রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওমর ইবনে আবি সালামাহ (রা.)-কে বলেছিলেন:"হে বৎস! আল্লাহর নাম নাও (বিসমিল্লাহ বলো), তোমার ডান হাত দিয়ে খাও এবং তোমার সামনের অংশ থেকে খাও।" — সহিহ বুখারি: ৫৩৭৬, সহিহ মুসলিম: ২০২১
- হাদিসের দলিল (পরিমিত আহার):নবীজি (সা.) বলেছেন: "মানুষ পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট আর কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। মানুষের পিঠ সোজা রাখার জন্য কয়েক লোকমা খাবারই যথেষ্ট। যদি তার চেয়ে বেশি খেতেই হয়, তবে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে।" — জামে তিরমিজি: ২৩৮০
১০. কৃপণতা ও লোভ পরিহার করা
নিজের হালাল উপার্জন থেকে পরিবার ও অভাবীদের ওপর ব্যয় না করে কৃপণতা করা মারাত্মক পাপাচার।
- কুরআনের দলিল:وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَّهُم ۖ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَّهُمْ"আল্লাহ যাদেরকে নিজ অনুগ্রহে ধন-সম্পদ দিয়েছেন, আর তারা তাতে কৃপণতা করে—তারা যেন মনে না করে যে এটি তাদের জন্য ভালো; বরং এটি তাদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।" — সূরা আলে ইমরান (৩:১৮০)
- হাদিসের দলিল:রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:"তোমরা কৃপণতা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ কৃপণতা তোমাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংস করেছে এবং তাদেরকে রক্তপাত ঘটানো ও হারামকে হালাল করার দিকে পরিচালিত করেছে।" — সহিহ মুসলিম: ২৫৭৮

0 মন্তব্যসমূহ